🚨 ই-রিটার্ন পোর্টালে বিগত বছরে ৫,০০০ টাকা জরিমানা দেখাচ্ছে? আর আয় না থাকলে কি রিটার্ন দেওয়াই লাগবে না? অসাধু চক্রের ফাঁদে পা না দিয়ে আসল নিয়মটি জেনে নিন! 🚨
সম্প্রতি অনেকেই অনলাইনে (e-Return পোর্টালে) ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের শূন্য রিটার্ন (Zero Return) জমা দেওয়ার পর কৌতূহলবশত বিগত বছরগুলোর (যেমন: ২০২৩-২০২৪ বা ২০২৪-২০২৫) অপশনে ক্লিক করছেন। আর সেখানে ঢুকলেই অটোমেটিক ৫,০০০ টাকা জরিমানা দেখতে পেয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে যাচ্ছেন! পাশাপাশি অনেকের মনেই প্রশ্ন— "আমার তো করযোগ্য কোনো আয়ই নেই, তাহলে আমি কেন রিটার্ন দেব?"
মানুষের এই অজ্ঞতা ও আতঙ্ককে পুঁজি করে বর্তমানে কিছু অসাধু চক্র ও দালাল সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাই পুরো বিষয়টি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতে নিচের নিয়মগুলো ভালোভাবে জেনে নিন:
🔍 ১. পোর্টালে অটোমেটিক ৫,০০০ টাকা জরিমানা কেন দেখাচ্ছে?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) তাদের অনলাইন সিস্টেমে চলতি করবর্ষের (২০২৬-২০২৭) পাশাপাশি বিগত বছরগুলোর বকেয়া রিটার্ন জমার অপশনও চালু করেছে।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের (Tax Day) মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে নতুন বা আগে কর নির্ধারণ হয়নি এমন করদাতাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
আপনি যখন পোর্টালে গিয়ে পুরোনো কোনো অর্থবছর (যেমন ২০২৩-২৪ বা ২০২৪-২৫) সিলেক্ট করছেন, তখন ওয়েবসাইটের সফটওয়্যারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরে নিচ্ছে যে—আপনি ওই বছরের একজন "বিলম্বিত করদাতা" (Late Filer) এবং এখন জরিমানা দিয়ে পুরোনো ফাইল ক্লিয়ার করতে চাচ্ছেন। সফটওয়্যারে সবার জন্য একই লজিক সেট করা থাকায় এটি সবাইকেই জরিমানা দেখাচ্ছে।
❌ ২. কারা এই জরিমানা দিতে বা পুরোনো রিটার্ন দিতে বাধ্য নন?
* যাঁরা নতুন টিন (TIN) খুলেছেন: আপনি যদি সম্প্রতি (যেমন ২০২৫ বা ২০২৬ সালে) নতুন টিন সার্টিফিকেট খুলে থাকেন এবং বিগত বছরগুলোতে আপনার কোনো করযোগ্য আয় না থাকে, তবে ২০২৩-২৪ বা ২০২৪-২৫ করবর্ষে আপনার তো কোনো টিনই ছিল না! তাই বিগত বছরের রিটার্ন বা জরিমানা কোনোটাই আপনার জন্য প্রযোজ্য নয়।
* যাঁদের পূর্বে করযোগ্য আয় বা বাধ্যবাধকতা ছিল না: শিক্ষার্থী, গৃহিণী, বেকার বা নতুন ফ্রিল্যান্সার—যাঁদের বিগত বছরগুলোতে করমুক্ত সীমার (সাধারণ ক্ষেত্রে ৩,৫০,০০০ টাকা) ওপরে কোনো আয় ছিল না এবং কোনো সরকারি/বেসরকারি সেবার জন্য বিগত বছরের রিটার্ন দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না, তাঁদের পুরোনো বছরের রিটার্ন দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
* যাঁরা বিগত বছরে অফলাইনে রিটার্ন দিয়েছেন: যাঁরা ২০২৩-২৪ বা ২০২৪-২৫ করবর্ষে সরাসরি কর অফিসে গিয়ে কাগজে (Offline) রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন, তাঁদের তথ্য অনলাইন পোর্টালে অটোমেটিক আপডেট না থাকায় অনলাইনে জরিমানা দেখাতে পারে। তাঁদের কাছে যেহেতু অফলাইনের রসিদ (Acknowledgement Receipt) আছে, তাই অনলাইনে আর কিছুই করতে হবে না।
✅ ৩. কারা এই জরিমানা দিয়ে রিটার্ন দিতে বাধ্য?
* পুরোনো টিনধারী ও করযোগ্য আয়ের ব্যক্তি: যাঁদের ২০২৩-২৪ বা ২০২৪-২৫ সালে টিন (TIN) খোলা ছিল এবং আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক ছিল (যেমন: করযোগ্য আয় ছিল বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যবসার লাইসেন্স/সেবা নিয়েছিলেন), কিন্তু অবহেলাবশত তখন রিটার্ন জমা দেননি—তাঁরা যদি এখন সেই বকেয়া বছরের ফাইল ক্লিয়ার করতে চান, তবে এই জরিমানা দিয়ে রিটার্ন জমা দিতে হবে।
* বিগত বছরের সনদের প্রয়োজন হলে: কেউ যদি ব্যাংক লোন, ভিসা প্রসেসিং, অডিট বা অন্য কোনো দাপ্তরিক কাজের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে বিগত বছরের (২০২৩-২৪ বা ২০২৪-২৫) ট্যাক্স সার্টিফিকেট দেখাতে চান এবং তা আগে জমা না দিয়ে থাকেন, তবে এখন জরিমানা দিয়ে সেটি জমা দিতে পারবেন।
🤔 ৪. চলতি বছরেও (২০২৬-২৭) যদি করযোগ্য আয় না থাকে, তবে কি রিটার্ন দেওয়া লাগবে?
এখানে দুটি বিষয় আলাদাভাবে বুঝতে হবে— 'আয়কর দেওয়া' (টাকা পরিশোধ করা) এবং 'রিটার্ন দাখিল করা' (আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়া)। আপনার বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার (৩,৫০,০০০ টাকা) নিচে থাকলে আপনাকে ১ টাকাও আয়কর দিতে হবে না। কিন্তু রিটার্ন দাখিল করবেন কি না, তা নির্ভর করে নিচের বিষয়গুলোর ওপর:
* কখন আয় না থাকলেও রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক?
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৬ ও ২৬৪ অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাংক লোন, ক্রেডিট কার্ড, ট্রেড লাইসেন্স, সঞ্চয়পত্র কেনা, নির্দিষ্ট অঙ্কের এফডিআর (FDR), জমি রেজিস্ট্রেশনসহ ৪০টিরও বেশি সেবা নিতে গেলে শুধু টিন (TIN) সার্টিফিকেট দেখালে কাজ হয় না; সাথে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র (PSR বা প্রাপ্তিস্বীকার পত্র) দেওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া নিজের নামে গাড়ি থাকলে বা কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার হলেও রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক। এসব কাজের যেকোনোটির জন্য টিন খুলে থাকলে, আপনার আয় শূন্য হলেও আপনাকে রিটার্ন জমা দিতেই হবে।
* কখন বাধ্যতামূলক নয়?
আপনি যদি শুধুমাত্র শখের বশে বা সাধারণ কোনো কাজে টিন খুলে থাকেন (যেখানে রিটার্ন জমার রসিদ বা PSR দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই) এবং আপনার কোনো করযোগ্য আয়ও না থাকে, তবে কঠোর আইনগত বিচারে আপনার জন্য রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক নয়।
💡 বাধ্যতামূলক না হলেও কেন 'শূন্য রিটার্ন' (Zero Return) দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ?
১. ভবিষ্যতের ঝামেলা এড়ানো: ধরুন, আপনার আয় নেই ভেবে আপনি আগামী ২-৩ বছর রিটার্ন জমা দিলেন না। কিন্তু ৩ বছর পর আপনার চাকরি, ব্যবসা, ভিসা প্রসেসিং বা ব্যাংকের কোনো জরুরি কাজে হঠাৎ ট্যাক্স সার্টিফিকেট বা PSR প্রয়োজন হলো। তখন ই-রিটার্ন পোর্টালে ঢুকলে মাঝখানের ওই না দেওয়া বছরগুলোর জন্য আপনার ফাইলে বকেয়া বা জরিমানা দেখাতে পারে, যা সমাধান করতে তখন কর অফিসে গিয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার ভোগান্তি পোহাতে হবে।
২. সম্পূর্ণ ফ্রি ও মাত্র ৫ মিনিটের কাজ: অনলাইনে শূন্য রিটার্ন দিতে ১ টাকাও খরচ হয় না এবং ঘরে বসে মোবাইল থেকেই ৫ মিনিটে জমা দেওয়া যায়। প্রতি বছর সময়মতো (১ জুলাই থেকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে) এটি জমা দিয়ে রাখলে আপনার ফাইলটি আজীবন একদম ক্লিন ও আপ-টু-ডেট থাকবে।
৩. টিন বাতিল করার সুযোগ: ভবিষ্যতে যদি মনে করেন আপনার টিন (TIN) সার্টিফিকেটের আর কোনো কাজই নেই, তবে পরপর ৩ বছর শূন্য রিটার্ন জমা দেওয়ার পর (অথবা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে) আয়কর আইনের ধারা ২৬২ অনুযায়ী আবেদন করে আপনার টিন নম্বরটি স্থায়ীভাবে বাতিল (Cancel) করে নিতে পারবেন। কিন্তু যতদিন টিন সচল রাখবেন, ততদিন প্রতি বছর শূন্য রিটার্ন দিয়ে রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ।
⚠️ ৫. অসাধু চক্র ও প্রতারকদের ফাঁদ থেকে সাবধান!
ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়ায় ও বিভিন্ন জায়গায় কিছু অসাধু চক্র সাধারণ মানুষের এই ভীতিকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে। তারা মানুষকে ভয় দেখিয়ে বলছে— "পোর্টালে যেহেতু ৫,০০০ টাকা জরিমানা উঠেছে, এটি না দিলে আপনার নামে মামলা হবে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ হবে অথবা ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের জরিমানা আসবে! আমাদের সাথে ইনবক্সে যোগাযোগ করুন, আমরা অল্প টাকায় আপনার এই জরিমানা মওকুফ বা সমাধান করে দেবো।"
সত্যটি হলো: আপনি যদি ওপরের "যাঁরা বাধ্য নন" তালিকায় পড়েন, তবে এই জরিমানা আপনার জন্য প্রযোজ্যই না। আপনি পোর্টালে পুরোনো বছরে সাবমিট না করলে আপনাকে ১ টাকাও দিতে হবে না। অথচ প্রতারক চক্র আপনার কাছ থেকে ১,০০০ বা ২,০০০ টাকা নিয়ে আসলে কিছুই করবে না (কিংবা শুধু পুরোনো ড্রাফটটি কেটে দেবে), কারণ সেখানে কিছু করার প্রয়োজনই নেই! তাই কেউ এই জরিমানা কমানোর বা সমাধান করে দেওয়ার কথা বলে টাকা চাইলে ভুলেও তাদের সাথে যোগাযোগ করবেন না এবং কোনো টাকা দেবেন না।
📌 সাধারণ করদাতাদের এখন চূড়ান্ত করণীয় কী?
১. পুরোনো অপশনে ক্লিক করবেন না: আপনার যদি বিগত বছরের রিটার্ন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকে, তবে ই-রিটার্ন পোর্টালে ঢুকে পুরোনো করবর্ষগুলো (২০২৩-২৪ বা ২০২৪-২৫) সিলেক্ট করবেন না। ভুল করে ক্লিক করে ফেললেও ফর্ম সাবমিট বা পেমেন্ট করবেন না; ওভাবেই রেখে বের হয়ে আসুন, এতে কোনো সমস্যা হবে না।
২. শুধু চলতি বছরের রিটার্ন দিন: শুধুমাত্র চলতি ২০২৬-২০২৭ করবর্ষের রিটার্নটি সঠিকভাবে দাখিল করুন এবং এর Acknowledgement Receipt (প্রাপ্তিস্বীকার পত্র) ও Tax Certificate ডাউনলোড করে রাখুন। আপনার সব দাপ্তরিক কাজে শুধু চলতি বছরের এই কাগজটিই লাগবে।
৩. সময়মতো রিটার্ন দিন: প্রতি বছর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে (১ জুলাই থেকে ৩০ নভেম্বর) অনলাইনে রিটার্ন জমা দিয়ে দিন। সময়মতো রিটার্ন দিলে কখনোই ১ টাকাও খরচ বা জরিমানা লাগবে না!
অযথা আতঙ্কিত হয়ে প্রতারকদের হাতে কষ্টের টাকা তুলে দেবেন না। নিজে সচেতন হোন এবং পোস্টটি শেয়ার করে অন্যদেরও প্রতারণার হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্য করুন।
লেখা: সাকিব আব্দুল্লাহ